Home » প্রবন্ধ » আটলান্টায় বাঙালি নাটকের উত্থান

আটলান্টায় বাঙালি নাটকের উত্থান

কল্লোল নন্দী
আটলান্টা
May 9, 2025

মাস্টারমশাই কি পড়াচ্ছেন সেদিকে নিতাইয়ের কোন মন নেই দেখে মাস্টারমশাই নিতাইকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা নিতাই ভগবান যদি দুটো থলি নিয়ে এসে তোমাকে বলেন একটি থলিতে বিদ্যা আছে এবং অন্যটিতে ধন। তুমি যে কোন একটি থলি নিতে পার। তুমি কোনটা নেবে? নিতাই নির্দ্বিধায় উত্তর দিল, আমি ধনের থলিটাই নেব। মাস্টারমশাই যথেষ্ট হতাশ হয়ে বললেন, আমি হলে বিদ্যার থলিটি নিতাম। নিতাই বলল, তা তো হবেই স্যার, যার যেটা কম আছে, সে তো সেটাই চাইবে। পরের প্রসঙ্গ অবান্তর। তবে যার যেটা কম সে তো সেটাই চায় – সেই নিয়েই এই প্রবন্ধ।

বিদেশে পাঁচ ঘর বাঙালি এক শহরে বাস করলে প্রথমেই তাঁরা যেটা করেন তা হল একটি দুর্গাপূজা। বাঙালির দুর্গাপূজা যতটা না ধার্মিক তার থেকে অনেক বেশী সাংস্কৃতিক। দুর্গাপূজা বাঙালির আইডেন্টিটি সিম্বল। ও ছাড়া বাঙালির বাঙালিয়ানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। দুর্গাপূজার সাথে চলে খাওয়া-দাওয়া এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে থাকে নাটক। বিদেশের যেকোনো শহরে বাঙালি সমাজ এই পরিকাঠামোয় গড়ে উঠেছে – এর মধ্যে কোন নতুনত্ব নাই – এমনকি অ্যাটলান্টাতেও – আমার শহর। আটলান্টায় ১৯৭৯ সালে প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজা হয় –  একজনের বাড়ির পিছনে, যাকে বলে ব্যাক ইয়ার্ড। তখনকার বাঙালিরা ১৯৮৩ সালের ৮-ই জুলাইয়ে আটলান্টা দুর্গাপূজা কমিটি নামে একটি সংগঠন রেজিস্ট্রি করেন।

যেহেতু বছরে একটিবার দুর্গাপূজা হয় তাই তখন বছরে একটিই নাটক হত। অ্যাটলান্টায় প্রথম বাংলা নাটক হয় ১৯৮২ সালে। এর ত্বত্যাবধানে ও নির্দেশনায় ছিলেন জয়ন্তী লাহিড়ী। অভিনয়ে ছিলেন মুকুট গুপ্ত, প্রণব লাহিড়ী, সমর মিত্র ও পার্থ মুখার্জি। প্রথমবার নাটক করার পরে এনারা বুঝলেন দর্শক এনাদের অভিনয়কে কলকাতার পেশাদারী অভিনেতাদের সাথে তুলনা করেন। তাই স্বাভাবিক কারণে এনাদের অভিনয় তেমন মনোগ্রাহী হয় নি। পরের বছর পার্থ মুখার্জি শঙ্করের লেখা একটি ছোটগল্প “চিন্তাহরণের প্রথম অঙ্গ”-টিকে নাট্যরূপ দেন যাতে আর তুলনা করা না-চলে। পার্থ মুখার্জির নির্দেশনায় এই নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। স্থানাভাবে যেখানে পূজা হত তার সামনেই অনুষ্ঠান হত এবং সেখানেই নাটক হত। অর্থাৎ পিছনে প্রতিমা, সামনে গান, নাচ, আবৃত্তি, বাজনা, এবং নাটক। সেই নাটকে না থাকত আলো, না থাকত মিউজিক। তবে থাকত একজন প্রম্পটার। যাঁরা এই অনুষ্ঠান করতেন, তাঁরা প্রসিনিয়াম থিয়েটার কি জানতেন না বা দেখেন নি – এমনটি না। ভায়ের মায়ের মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই, তার বেশী আর সাধ্য নাই – ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম।

একটি ঘটনা বলি। হয়ত পরিস্থিতিটা কিছুটা বোঝানো যাবে। সেই সময়ে মহিলারা শার্ট-প্যান্ট বা স্কার্ট-ব্লাউজ ছাড়া অন্য কিছু পরে বাড়ির বাইরে বের হতেন না। আর পুরুষেরা শার্ট-প্যান্ট-টাই। কিন্তু দুর্গাপূজায় যদি শাড়ি-ধুতি-পাঞ্জাবি না-পরা যায় তাহলে অমন দুর্গাপূজা করার কি মানে? তাই বাড়ি থেকে সকলে শার্ট-প্যান্ট পরে বের হতেন – নিজের গাড়িতে। সুটকেসে থাকত শাড়ি-ধুতি-পাঞ্জাবি। অনুষ্ঠান বাড়িতে এসে তাঁরা সেই শাড়ি-ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন। ফিরত যাবার সময় কি করতেন তা যথেষ্টই অনুধাবন যোগ্য।

একবার পূজা-অনুষ্ঠান শেষ করে সব গোছাতে গোছাতে অনেক দেরী হয়ে যাওয়ায় এক দম্পতি ঠিক করলেন একেবারে বাড়িতে গিয়ে পোশাক বদল করবেন। তাঁরা নিজেদের গাড়িতে উঠে রওনা দিলেন – মহিলাটি শাড়ি পরে। রাস্তায় অন্য একটি গাড়ি এসে ওনাদের গাড়িতে ধাক্কা দেয়। নিয়ম মাফিক পুলিশ আসে। পুলিশ অফিসার এই মহিলাটিকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ম্যাম টুডে ইস নট দ্যা হ্যালোয়িন ডে! হোয়াট ডিড ইয়ু পুট অন? হোয়াট শর্ট অফ কস্টিউম ইজ ইট?

এই আমেরিকায় বাঙালি নাটক হবে স্টেজে? বাঙালি ওথেলো করতে পারে, ম্যাগবেথ করতে পারে। কিন্তু তাতে তো বাঙালিয়ানার পরিচর্যা হয় না। ওই যে বললাম, যার যেটা কম সে তো সেটাই চায়। এই সময়ের নাটকে মুনশিয়ানা ছিল না ঠিকই, কিন্তু নাটক নিয়ে উন্মাদনা ছিল না বা এর পৃষ্ঠপোষক ছিল না – তেমনটা নয়।

আটলান্টা দুর্গাপূজা কমিটি ১৯৮৩-র ১১ই অক্টোবর নন-প্রফিট ট্যাক্স একজেম্পট স্যাটাস পায়। ক্রমে ক্রমে আরো অনেক ভারতীয় এই পূজা এবং অনুষ্ঠান দেখতে আসেন। তাঁদের অনেকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেন। ধীরে ধীরে আটলান্টা দুর্গাপূজা কমিটি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই দুর্গাপূজা ছিল বাঙালির অনুষ্ঠান, কেবল হিন্দু অনুষ্ঠান না। অল্প সংখ্যক হলেও সেখানে ব্রাহ্ম, আফগানি, বাংলাদেশী, এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনও আসতেন। তাঁদের অনেকে সক্রিয়ভাবে অনুষ্ঠানে যোগদানও করতেন। নিজেদের এত প্রতিষ্ঠা তখনকার বাঙালি সমাজের বোধহয় ভালো লাগে নি। বাঙালিরা যে উদ্যমে কিছু বানাতে পারে, তার থেকে বেশী উদ্যমে নিজেদের তৈরিকে ভাঙতেও পারে। ১৯৮৬ সালে এনারাই আটলান্টা দুর্গাপূজা কমিটি ভেঙ্গে নতুন দুইটি সংগঠন – বাগা (বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ গ্রেটার অ্যাটলান্টা) ও পূজারী তৈরি করেন। তারপর ১৯৮৭ সালের ২৫-সে জুন যারা আটলান্টা দুর্গাপূজা কমিটি সংগঠনটিকে তৈরি করেছিলেন তাঁরাই এটাকে আইনত বন্ধ করে দেন। এর পরে আরো কয়েকটি বাঙালি সংগঠন তৈরি হয়েছে। সেগুলির কোনটা এখনো আছে, কোনটা নেই। বাগা ও পূজারী এখনো আছে। এখনও অবধি অ্যাটলান্টায় এই দুটিই হল বাঙালির বড় সংগঠন। এই দুই সংগঠনের দুর্গাপূজায় এখনো নাটক হয়।

সবকিছুরই একটি ভালো দিক থাকে। আগে বছরে একটি নাটক হত। দুইটি সংগঠন হওয়াতে বছরে দুটি নাটক করার সুযোগ হল তখন। সেইকালে দুর্গাপূজায় কাঞ্চন রঙ্গ, ভাড়াটে চাই, বাঞ্ছারামের বাগান, কেনারাম বেচারাম – এই ধরনের নাটক হত। দর্শকদের চাহিদা ছিল একটাই – পূজায় হাসির নাটক চাই। এই অবধি হল অ্যাটলান্টায় বাঙালি সমাজ প্রতিষ্ঠানের এবং বাংলা নাটকের প্রথম ধাপ।

১৯৯৬-এ আটলান্টায় অলিম্পিক হওয়াতে আটলান্টা শহরের আমূল উন্নতি হয়। তার পরেই ডট-কম এবং ওয়াই-টু-কে – এই দুই কাজের চাহিদায় অনেক ভারতীয় আমেরিকায় আসেন। আটলান্টায়ও বাঙালির সংখ্যা বাড়ে। মহিলারা তখন শাড়ি পরে দুর্গাপূজায় যেত, দোকান-বাজারে যেত না যদিও।

পুরানো বাঙালির সাথে এই নতুন আসা বাঙালিদের দৃষ্টিভঙ্গির একটা তফাৎ ছিল। যে যখন দেশ ছেড়ে বিদেশে বাস শুরু করেন, তখন ছেড়ে আসা দেশের সেই সময়ের সাংস্কৃতিক চালচিত্রটাই তাঁর মনে একটা পাকাপাকি স্থান নেয়। তাঁর মানস পটে সেইটেই হয় বাঙালি সংস্কৃতির রূপ ও রেখা। এর ব্যতিক্রম নাই বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না, আর থাকলেও সেটা ব্যতিক্রম মাত্রই। এই নতুনেরা বাংলা সংস্কৃতির অধঃপতনের মধ্যে বড় হয়েছে। উচ্চমানের শিল্প সাহিত্য নাটক যেমন দেখেছে, তেমনি দেখেছে নিম্নমানের কাজ। রাজনীতি থেকে আদর্শ যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বা শেষ সুতোয় ঝুলছে সেই সময়ের মধ্যে তাঁদের ছাত্রকাল কেটেছে। সামাজিক পরিবর্তন তাঁরা যেভাবে দেখেছেন এর আগের প্রজন্ম সেইভাবে দেখেননি। সুতরাং আগের প্রজন্মের বাঙালির সাথে এই নতুন প্রজন্মের একটা অনিবার্য সাংস্কৃতিক সংঘাত ঘটে। পুরানোরা নিজেদের জায়গা ছাড়বে না, আর নতুনেরা নিজেদের জায়গা করে নিতে চায়। এর ফলে নতুন কিছু বাঙালি ক্লাব গড়ে ওঠে। অনুষ্ঠানের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আসে এবং তার প্রভাব নাটকেও পরে।

১৯৯০ দশকের শেষ দিকে নাটকে আলোর ব্যবহারের একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়, তবে সেটা হল কন্সট্রাকসন লাইট, স্টেজ লাইট নয়। তার অনেক পরে মিউজিক আসে। তখনও পিছনে প্রতিমা, সামনে নাটক, এবং পাশে প্রম্পটার। সেই স্টেজে নাটকে ব্যবহার যোগ্য কোন সাইড উয়িন্স ছিল না। নাটকে একাধিক সেট থাকলে স্টেজের একদিকে আলো এবং অন্যদিক অন্ধকার করে কাজ চালানো হত। অনেকটা যাত্রাপালার পরিকাঠামোতে প্রসিনিয়াম থিয়েটার করার প্রচেষ্টা। এইরকম পরিকাঠামোয় যে ধরনের নাটক করা যায় অর্থাৎ স্ট্রিট থিয়েটার বা থার্ড থিয়েটার – সেইরকম একটি প্রচেষ্টা হয়েছিল একবার। বাদল সরকারের লেখা ‘হট্টোমল্লার ওপারে’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। তবে বেশীরভাগ দর্শকের কাছে এটি তেমন মনোগ্রাহী হয় নি। অপটু অভিনয় তার মূল কারণ হলেও, তখনকার বাঙালি এই বিষয়টি থেকে বিনোদনের কোন উপাদান পান নি। ফলত আবার সেই হাসির নাটকেই ফেরত যায়। এরপরেও আরো কয়েকবার অন্য বিষয়ের নাটক দুর্গাপূজার স্টেজে হয়েছিল। জনপ্রিয় সিনেমার গল্প নিয়েও নাটক হয়েছিল। সময়ের অভাবে নাটকের সংলাপ সকলের পুরো মুখস্থ হত না এবং সর্বোপরি একটি নিশ্চুপ পরিবেশের অভাবে সংলাপ বললেও প্রথম কয়েক সারির পরে সেই সংলাপ শোনা যেত না। তাই একটা সময়ে নাটকের সংলাপ রেকর্ড করে সেটা চালানো হত এবং কলাকুশলীরা স্টেজে সেই সংলাপ আওরাতেন। তিন পাশ খোলা, আলোর বন্দোবস্ত বিহীন স্টেজে পিছনে প্রতিমা, তার সামনে পূজা সামগ্রী, তার সামনে হত নাটক – সে নাটকের বিষয় যাই হোক না কেন। আমার এক বন্ধু Assassination বানানটি মনে রাখার একটি সহজ উপায় বলেছিল – গাধ্যে কে উপর গাধ্যে, উসকে কে উপর হাম, ওউর উসকে উপর জাতি। নাটক করার পরিকাঠামোটি অনেকটা সেইরকম।

এরপরে ২০০০ দশকের মাঝামাঝিতে দুর্গাপূজা সেই চিরাচরিত স্থান থেকে সরে নানান স্কুলে হতে শুরু হল। সেখানে ক্যাফেটেরিয়ায় পূজা হত এবং অনুষ্ঠান হত স্কুলের জিমে বা অডিটোরিয়ামে। অনুষ্ঠানের সামগ্রিক একটা উন্নতি হল। নাটক একটা প্রপার স্টেজ পেল, কিছুটা হলেও আলো পেল, কলাকুশলীরা ড্রেসিং রুম পেল, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বাজানোর মত একটা ব্যবস্থা হল। নাট্টোৎসাহীরা এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলেও দর্শক কিন্তু যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই থেকে গেল। সারা সপ্তাহের খাটুনির পরে, সংসার ও কর্মক্ষেত্রের নানান ঝঞ্ঝাট সামলে বাঙালিরা দুর্গাপূজায় আসে বিনোদনের জন্যে। এছাড়া বাঙালি জাতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল এনারা চিন্তা ও ভাবনায় আন্তর্জাতিক। এনারা নিজের পাড়ার রাস্তা পরিষ্কার রাখতে আগ্রহী নন, যে দু-একটি অতি সহজ কাজ করলেই নিজের পরিবেশের উন্নতি অনিবার্য – তাতে তাঁদের কোন উৎসাহ নাই – অন্যেরা কি করলে গ্লোবাল ওয়াইন হ্রদ হবে – সেই নিয়ে প্রত্যেক বাঙালি একটি করে থিসিস লিখতে পারেন। বাঙালিরা সারা পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে পারেন কেবল তাঁদের নিজের পাড়াটি বাদে – কারণ সেইটি সরকারের কাজ। এই বাতুল সত্যটি এই প্রসঙ্গে বলার কারণ এতদিন পরিকাঠামোর অভাবে যে ধরনের নাটকগুলি করা সম্ভব ছিল না, সেইটের কিছু সুরাহা যখন হল তখন নাটকের বিষয়ের অভাবটি প্রকট হয়ে দেখা দিল। নাটকের বিষয়ে অ্যাটলান্টা বা আমেরিকার কোন প্রেক্ষাপট উঠে এল না। সেই পুরানো নাটক। বড়জোর পশ্চিমবঙ্গের লেখক-লেখিকার জনপ্রিয় কোন গল্পকে নাট্যরূপ দিয়ে নাটক হয়েছে, কিছু মেডলি গোছের নাটক হয়েছে। এখানকার বাঙালিরা নস্টালজিয়া থেকে আজও বের হতে পারেন নি। তার উপরে ওই যে বললাম, যে যখন দেশ ছেড়ে বিদেশে বাস শুরু করে, ছেড়ে আসা দেশের সেই সময়ের সাংস্কৃতিক চালচিত্রটাই তাঁর মানস পটে সংস্কৃতির রূপ ও রেখা হয়ে বসে থাকে। তার প্রতিফলন নাটকের বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

যাই হোক, ততদিনে ক্লাবের স্টেজে বছরে একটি নাটক করে নাট্য উৎসাহীদের মন ভরে না। কিছুটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে এবং কিছুটা ব্যক্তিগত উদ্যোগে আটলান্টায় প্রথম একটি নাটক দল তৈরি হয়। এর উৎপত্তি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে, কানাকানি, এবং রাজনীতিও আছে। মূলত এটা কি আরেকটি বাঙালি ক্লাব হতে চলেছে নাকি? – সেই সন্দেহে। এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার জন্যে এই নাটক দলটি এই দলের নাম রেখেছিল – “জাস্ট নাটক”।

এই জাস্ট নাটকই ২০০৫ সালে প্রথম প্রসিনিয়াম থিয়েটার হলে ‘হানিমুন’ নাটকটি করে। যেহেতু লোকে টিকিট কেটে শুধুমাত্র নাটক দেখার জন্যেই আসে এবং দুর্গাপূজার স্টেজে নাটক করে যারা তৃপ্ত নয় তাঁরা এই নাটক দলে যোগ দেয় ও সর্বোপরি এই নাটকগুলি প্রসিনিয়াম থিয়েটার স্টেজে হয় তাই সবমিলিয়ে খুব সাধারণভাবেই নাটকের পরিবেশনায় কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। এই দলের নাটকের বিষয়ও প্রায় একই ছিল এবং এনারাও কিন্তু প্রম্পটার ছাড়া নাটক করেন নি। এনারা যে নাটকগুলি মঞ্চস্থ করেছিলেন, সেগুলো হল জয় মা কালী বোর্ডিং, সাড়ে চুয়াত্তর, কবি কাহিনী ইত্যাদি। অর্থাৎ ঘুরে ফিরে সেই হাসির নাটক। ২০১০ সালে এই নাটক দলটি তাদের শেষ নাটক ‘ভাড়াটে বিভ্রাট’ করার পরে নানাবিধ কারণে দলটি ভেঙ্গে পরে এবং কিছুদিন পরে এই দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

২০১১ সালে অ্যাটলান্টায় আরেকটি নাটকের দল তৈরি হয় – অ্যাটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপ। ২০১১ সালের ২রা এপ্রিল এনাদের প্রথম শো-য়ে ‘পশুপতি অপেরা’ এবং ‘একটি অবাস্তব গল্প’ নাটক দুটি মঞ্চস্থ করেন। এখনো অবধি যতগুলো নাটকের দল অ্যাটলান্টায় টিকে আছে তার মধ্যে অ্যাটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপ বয়স জ্যেষ্ঠ। এঁনারা প্রতি বছর একটি করে নাটক শো করেন – কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এই প্রথম একটি বাঙালি নাটক দল অ্যাটলান্টায় অ্যামেচার থিয়েটার করলেও একটি থিয়েটার যেরকমটি হওয়া উচিৎ সেরকমভাবে নাটক উপস্থাপনা করেন। এরাই প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নাটক করেন যেখানে কোন প্রম্পটার ছিল না, ছিল আলো, মিউজিক, এবং সর্বোপরি সুন্দর অভিনয়। বলা যেতে পারে এই প্রথম অ্যাটলান্টার বাঙালি সমাজ হাসির নাটকের বাইরে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক দেখতে পেলেন এবং দর্শকও সেইটিকে গ্রহণ করলেন। এর প্রভাব দুর্গাপূজার স্টেজে হওয়া নাটকের উপরেও পরে। এর আগে হাসির নাটকের বাইরে অন্যরকম নাটক করার চেষ্টা হয় নি সেটা নয়। তবে দর্শক সেগুলোকে তেমনভাবে গ্রহণ করেন নি। তার প্রধান দুটি কারণ হল পরিবেশনায় ত্রুটি এবং ব্যবস্থাপনায় অভাব। এই হল অ্যাটলান্টায় বাঙালি সমাজে নাটক চর্চার দ্বিতীয় ধাপ।

এরমধ্যে দেব-শঙ্কর হালদার অ্যাটলান্টায় একটি ওয়ার্কশপ করেন। দু-এক দিনের ওয়ার্কশপ করে নাটকের মান যে আহামরি কিছু উন্নত হয়ে যায় তেমনটি নয়। তবে নাট্য উৎসাহীরা এই ধরেনের ওয়ার্কশপের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন সেটাই বড় কথা।

ইতিমধ্যে আরেক প্রজন্মের বাঙালি এদেশে এসেছেন। তখন ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো এদেশে বসে দেখতে পাওয়া যায় এবং ইন্টারনেটের সাহায্যে সারা পৃথিবীতে সকলেই সকলের সাথে সহজেই যোগাযোগ করার একটা সহজ উপায় হয়ে গেছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে। খুব স্বাভাবিক কারণেই এই প্রজন্মের ধ্যানধারণা, চিন্তাভাবনা, এবং বিনোদনের বিষয় আগের দুই প্রজন্মের থেকে সম্পূর্ণ (ফান্ডামেটালি) পৃথক। সুতরাং আগের দুই প্রজন্মের সাথে নতুন প্রজন্মের আরেকটি সংঘাত এসে পরে। এঁদের চাহিদা, বিনোদনের বিষয় এবং নাটক নিয়ে এঁদের ধারণা একেবারে আলাদা। যে নাটকের বিষয় এঁদের ভালো লাগে পুরানোদের তা ভালো লাগে না। মাঝের প্রজন্মের অবস্থা আরো সঙ্গিন – পুরানো প্রজন্মকে ছাড়তে পারে না, নতুন প্রজন্মকে মন থেকে আলিঙ্গন করতে পারে না।

যাই হোক, অ্যাটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপের প্রথম শো হওয়ার পরের বছর, অর্থাৎ ২০১২ সালে অ্যাটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপের একাংশ সেই দল থেকে বের হয়ে যান এবং অন্য একটি নাটক দল তৈরি করেন – দলের নাম রাখেন – অভিনয়ম। এনারাও বছরে একটি করে নাটক করেন। ২০১৬ সালের ২০শে নভেম্বর এই নাট্য দলের প্রথম প্রোডাকশন হয়েছিল ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’। পরে এনারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রফেশনাল নাট্য পরিচালক ঊষা গাঙ্গুলিকে এনে এবং তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শিখে নাটকের মান কিছুটা উন্নত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোন মৌলিক পরিবর্তন নজরে আসে না। যাই হোক, অভিনয়ম এবং অ্যাটলান্টা থিয়েটার ওয়ার্কশপের প্রযোজনায় অ্যাটলান্টার বাঙালি দর্শক কিছু ভালো লোকাল প্রোডাকশন দেখতে পেয়েছেন। এই দুই দলই নিজেরা কিছু নাটক রচনা করেছেন তবে মূলত সেই পুরানো গল্পের প্লট নিয়েই এঁনারা কাজ করেন।

এর পরে আরও দুটি নাটক দল তৈরি হয়েছিল। তাঁরা একটি বা দুটির বেশী নাটক করেন নি। তারপর সেগুলি বন্ধ হয়ে যায়। এনারাও এমন কিছু নাটক করেন নি যা এখানকার বাঙালির মনে দীর্ঘকালীন কোন ছাপ রেখে যায়।

এরপরে ২০১৯ সালে ‘আবহ’ নামে একটি নাটক দল গড়ে ওঠে। ভালো নাটক করার ইচ্ছে আছে অথচ বিষয়গতভাবে ভালো নাটক তেমনভাবে এখানে হচ্ছে না – এই হতাশা নিয়ে কিছু নাট্টোৎসাহী এই আবহ দলটি তৈরি করেন। তাঁদের প্রথম প্রোডাকশন ছিল সুদীপ্ত ভৌমিকের লেখা ‘অজ কাহিনী’। যদিও অজ কাহিনী নাটকটি মূলত মঞ্চ নাটকের জন্যে লেখা এনারা এটিকে শ্রুতি নাটক করে পরিবেশন করেন।

২০২০ সাল থেকে আবহ আয়োজন করে আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব, যা হয়ে ওঠে এক অভিনব ডিজিটাল মঞ্চ। এই উৎসবে আমেরিকার বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি কানাডা, ভারত, বাংলাদেশ, গ্রেট ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, দুবাই এবং অস্ট্রেলিয়ার নানা নাট্যদল অংশ নেয়। অনলাইন মাধ্যমে নাট্য প্রদর্শনীর পাশাপাশি আবহ নাট্য আলোচনাচক্র ও সেমিনার আয়োজন করে।

২০২৩ সালে এনারা ‘আবহ আর্ট অ্যান্ড থিয়েটার ফেস্টিভাল’ শুরু করেন যা মঞ্চস্থ নাটক ও শিল্প প্রদর্শনীর এক সম্মিলিত আয়োজন। এখানে বাংলা, হিন্দি ও ইংরাজি ভাষায় নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এই নাট্যোৎসবে একটি বিশেষত্ব হল প্রতিটি নাটকের পরেই দর্শক ও সেই নাটকের অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। এই তাৎক্ষণিক আলোচনায় দর্শকেরা সেই নাটকের বিষয় ও নাটকের পরিবেশনা নিয়ে প্রশ্ন করেন। নাট্য দলের দায়িত্ব হল সেইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। যেকোনো পারফর্মিং আর্টের তাৎক্ষণিক মূল্যায়নই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। তাই এই মঞ্চে নাটক পরিবেশনাটি যতখানি গুরুত্ব বহন করে, এই তাৎক্ষণিক প্রশ্নোত্তরের আসরটিও ততখানিই গুরুত্ব বহন করে। আবহ আর্ট অ্যান্ড থিয়েটার ফেস্টিভালে কেবল অ্যাটলান্টার স্থানীয় নাট্যদল নয়, আমেরিকার অন্যান্য শহরের নাট্যদলও আসে। নাটক পরিবেশনার পাশাপাশি, এই নাট্য উৎসবে স্থানীয় শিল্পীর বানানো ছবি ও ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়। নাটকের সমসাময়িক প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা সভা হয়।

২০২৪ সাল থেকে আবহ প্রতি বছর একজন নাট্য ব্যক্তিত্বকে থিয়েটার জগতে তাঁর আজীবন অবদানের জন্য ‘আবহ সম্মান’ পুরস্কার দেওয়া শুরু করে। একই বছরে একটি পোস্টার প্রদর্শনী হয় যার বিষয় ছিল স্বাধীনতা উত্তর  ভারতীয় নাটকের ইতিহাস। আমেরিকায় ভারতীয় নাটক নিয়ে এই ধরেনের প্রদর্শনী বোধহয় এইটাই প্রথম। আবহ দলটিই অ্যাটলান্টা শহরে প্রথম ভারতীয় নাট্য উৎসব শুরু করে যা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক নাট্যচর্চার মঞ্চ হয়ে উঠছে।

বেশীরভাগ নাট্যদলে একজন মাত্র নিদের্শক থাকেন। আবহ দলের একটি বিশিষ্ট হল এই দলে একাধিক নিদের্শক ও নাট্যকার আছেন। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ অবধি ৪টি শ্রুতিনাটক ও ১৫টি মঞ্চনাটক এনারা করেছেন। এরমধ্যে এই দলের চারজন নাট্য নির্দেশনার কাজ করেছেন এবং তিনজন নাটক লিখেছেনও। এছাড়া এনারা ২০২২ সালে শ্রী সৌমিত্র মিত্রের নির্দেশনায় ‘পটলবাবু ফিল্ম স্টার’ এবং ২০২৪ সালে শ্রী দেবাশিস মজুমদারের নির্দেশনায় ‘রাঙামাটি’ নাটক দুটি করেন। আবহ মূলত বাংলা নাটক করলেও সে দলে নাট্যোৎসাহী অবাঙালি-প্রবাসীরাও যোগ দিয়েছেন।

আমেরিকায় ভারতীয় নাটক, বিশেষত বাঙালি নাটক সাধারণত একটিবার মঞ্চস্থ হয়। তিন-চার মাস রিহার্সাল করে একটি নাটক প্রস্তুত করা হয় কেবল একটি অনুষ্ঠান করার জন্যে। এর মূল কারণ নাটকের দর্শক কম এবং নাটকের হল ভাড়া অত্যন্ত বেশী। তাই একটি নাটক একবারের বেশী মঞ্চস্থ করা সম্ভব হয় না। প্রায়শই একবার প্রপার স্টেজ রিহার্সাল করাও সম্ভব হয় না। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে নাটকের দলগুলি তাঁদের একটি প্রোডাকশনকে যে পূর্ণতায় নিয়ে যেতে পারেন আমেরিকায় বাঙালি নাটকদল সেটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। তার উপরে যারা নাটক করেন তাঁদেরকেই মঞ্চ সাজাতে হয়, কস্টিউম বানাতে হয়, টিকিট বিক্রি করতে হয়, এবং শো-এর পরে সেট খুলে নিয়ে যেতে হয়। এই সেট, কস্টিউম আর কখনোই কাজে লাগে না। এত শত সব কিছুই করেন কেবল একটি শো-এর জন্যে।

এই অবধি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা ভাবছেন এতই যখন দুঃখ তখন অন্য শহরে তোমাদের শো নিয়ে যাও না কেন বাপু? কোন কোন দল সেই চেষ্টা করে। তবে অন্য শহরে গিয়ে নাটক করার একটা সাংসারিক অসুবিধা থাকে। কারণ এখানে কোন রামুর মা নাই, গোপালের পিসি নাই, গাড়ি আছে তবে ড্রাইভার নাই। রান্না করা, বাসন মাজা, ঘর ঝাড়া, কাপড় কাঁচা, ছেলেমেয়েকে নাচের ক্লাস,গানের ক্লাস নিয়ে যাওয়া-আসা থেকে শুরু করে লনের ঘাস কাঁটা সব কিছুই নিজেদের করতে হয় সপ্তাহান্তের ওই দুটি দিনে। তার উপরে কল শো-তে যেতে হয় নিজেদের টাকায়, থাকতে হয় নিজেদের টাকায়, এমনকি সেখানে খাওয়ার খরচও নিজেদের। একটি কল শো করতে একটি দলের যা খরচ হয় তার পরিমাণ মোটামুটি একজন গড় আমেরিকানের এক মাসের রোজগারের সমান বা কিছু বেশী। কোন বাঙালি নাটক দলের এত বাজেট থাকে না যে তাঁরা এই খরচ বহন করতে পারেন। তাই প্রবল ইচ্ছা থাকলেও একটি বা দুটির বেশী কল শো করা সম্ভব হয় না।

আমেরিকায় বাঙালি নাটক করার অন্যতম শর্ত হল ভালোবেসে নাটক কর। কেবল শিল্প ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসে বাঙালি কৃষ্টির পরিচর্যা করার জন্যে এনারা নাটক করেন। মনে প্রাণে Art is for human’s sake চাইলেও দিনের শেষে তাই Art is for art’s sake – ই নিবদ্ধ থাকে। এই দ্বন্দ্বই প্রবাসী বাঙালিকে তাড়না করে চলে। একটু আগে নিন্দুকের মত বলেছি বাঙালি জাতির একটি বৈশিষ্ট্য হল এনারা চিন্তা ও ভাবনায় আন্তর্জাতিক। এর কিছু সুদিকও আছে। এখানকার বাঙালিরা সে যে নাট্যদলের সাথে যুক্ত থাকুক না কেন, বা না থাকুক, সারা পৃথিবীর বাংলা নাট্যোৎসাহীদের জন্যে একটা মঞ্চ তৈরি করার কাজ করে যাচ্ছে। আগামীতে কথা হবে।

This was published in Shudrak’s 2025 Magazine

Cover page designer: Kallol Nandi

Site Contents